বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ দেড় যুগের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল এর সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া দেশের প্রথম সাংবিধানিক গণভোট। উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
নির্বাচনী ফলাফলের সারসংক্ষেপ
নির্বাচন কমিশনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় (একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি স্থগিত)। এর মধ্যে ২৯৭টি আসনের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়:
- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
- বিএনপি জোট: শরিকদের নিয়ে মোট ২১২টি আসনে বিজয় নিশ্চিত করেছে।
- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে, যা দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসনপ্রাপ্তি।
- জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট: মোট ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।
- জাতীয় নাগরিক দল (এনসিপি): ৬টি আসনে জয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেছে।
- অন্যান্য: স্বতন্ত্র ও ক্ষুদ্র দলগুলো ১৩টি আসনে জয়লাভ করেছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: পাল্টে যাচ্ছে সংবিধান
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা এদিন অংশ নিয়েছিলেন একটি ঐতিহাসিক গণভোটে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের ওপর এই ভোট নেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ৬৮.০৬% ভোটার সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো যুগান্তকারী সংস্কারগুলো আইনি ভিত্তি পেতে যাচ্ছে।
রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের চিত্র
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে বিএনপি এবং ৭টিতে তাদের মিত্র দলগুলো জয়ী হয়েছে।
- তারেক রহমানের জয়: ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই বিজয়কে দলের সমর্থকরা ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’ হিসেবে দেখছেন।
- হেভিওয়েট বিজয়: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১), মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮), আমানউল্লাহ আমান (ঢাকা-২) এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫) বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
- তরুণ নেতৃত্বের উত্থান: ঢাকা-৬ আসনে ইশরাক হোসেন এবং কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহর বিজয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের আগমনের বার্তা দিচ্ছে।
শান্তিপূর্ণ ভোট ও রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর একটি প্রতিযোগিতামূলক ভোট হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। গড় ভোটার উপস্থিত ছিল প্রায় ৬০%, যা গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বিবৃতিতে বলেন, “জনগণ তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অভিনন্দন
বিএনপির এই বিশাল জয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। বিজয়ের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফোন করে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোদি তার বার্তায় বাংলাদেশে একটি “গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক” সরকারের সাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলো এই নির্বাচনকে একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করে অভিনন্দন জানিয়েছে।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এই বিজয় জনগণের বিজয়। আমাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংস হওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মেরামত করা এবং অর্থনীতিকে সচল করা।” তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের কোনো ধরনের বিজয় মিছিল বা প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড না করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
আগামী সরকারের জন্য প্রধান কাজগুলো হবে:
১. আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠন: পুলিশের সংস্কার ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রিজার্ভ বৃদ্ধি।
৩. দুর্নীতি দমন: গত দেড় দশকের দুর্নীতির বিচার ও লুটপাট হওয়া অর্থ ফেরত আনা।
৪. সংবিধান সংস্কার: গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন।
উপসংহার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের গুমরে থাকা আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন নতুন এক যাত্রার অপেক্ষায়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার কেবল রাজনৈতিক জয় নয়, বরং জনকল্যাণ ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।