বাঙালি মানেই ভোজনরসিক, আর উৎসব বা অতিথি আপ্যায়নে আমাদের প্রথম পছন্দই থাকে পোলাও, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি। কিন্তু সব সময় কি আর রিচ ফুড খেতে ভালো লাগে? মাঝে মাঝে জিহ্বায় এমন কিছু স্বাদের প্রয়োজন হয় যা একই সাথে হবে হালকা, সুগন্ধি এবং রুচিসম্মত। ঠিক এমনই একটি পদ হলো ‘লেমন রাইস’।
সাধারণত দক্ষিণ ভারতীয় লেমন রাইসের সাথে আমরা পরিচিত হলেও, আজকের রেসিপিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতে ব্যবহার করা হয়েছে চিকেন স্টক, বাটার, কাঠবাদাম এবং এক বিশেষ রান্নার পদ্ধতি যা এই রাইসকে করে তোলে ঝরঝরে ও শাহী স্বাদের। লেবুর সতেজ ঘ্রাণ, বাটারের স্নিগ্ধতা এবং ড্রাই ফ্রুটসের ক্রাঞ্চিনেস—সব মিলিয়ে এই ডিশটি আপনার দুপুরের খাবার বা রাতের ডিনারকে করে তুলবে স্মরণীয়।
আজকের ব্লগে আমরা জানবো প্রখ্যাত রন্ধনশিল্পী আতিয়া আমজাদের রেসিপি অবলম্বনে কীভাবে তৈরি করবেন এই স্পেশাল লেমন রাইস।
কেন এই রেসিপিটি স্পেশাল?
সাধারণ লেমন রাইস মূলত ভাত রান্না করার পর লেবু ও ফোঁড়ন দিয়ে মাখানো হয়। কিন্তু এই রেসিপিতে চাল রান্না করা হয় 'ডাবল বয়লার' পদ্ধতিতে এবং পানির বদলে ব্যবহার করা হয় চিকেন স্টক। এতে চালের প্রতিটি দানায় স্টক এবং মশলার স্বাদ ঢুকে যায়। এছাড়াও মধু ও লেবুর সংমিশ্রণ এতে আনে টক-মিষ্টির এক দারুণ ব্যালেন্স।
আসুন জেনে নিই রান্নার বিস্তারিত প্রক্রিয়া।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
রান্না শুরুর আগে সব উপকরণ হাতের কাছে গুছিয়ে নিলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এই পরিমাপে ৩-৪ জন অনায়াসেই খেতে পারবেন।
প্রধান উপকরণ:
* বাসমতী চাল: ১ কাপ (ভালো মানের লম্বা দানা)
* চিকেন স্টক: পৌনে ২ কাপ (চাল সেদ্ধ হওয়ার মূল মাধ্যম)
* পানি: পৌনে ১ কাপ
* লেবুর রস: ৩ টেবিল চামচ (ফ্রেশ লেবু থেকে নেওয়া)
* লেমন জেস্ট: ২ চা-চামচ (লেবুর খোসার ওপরের সবুজ/হলুদ অংশ মিহি কুচি)
ড্রাই ফ্রুটস ও সবজি:
* কাঠবাদাম: আধা কাপ (পুরো বা স্লাইস করা)
* কিশমিশ: সোয়া কাপ
* মটরশুঁটি দানা: ১ কাপ (ফ্রেশ বা ফ্রোজেন)
* পেঁয়াজ কুচি: সোয়া কাপ (মিহি করে কাটা)
মশলা ও ফ্লেভার:
* এলাচ গুঁড়া: আধা চা-চামচ
* জয়ফলের গুঁড়া: সোয়া চা-চামচ (খুব সামান্য, শুধু ফ্লেভারের জন্য)
* মাখন বা মার্জারিন: ১ টেবিল চামচ
* মধু: ২ টেবিল চামচ (ইচ্ছানুযায়ী, তবে দিলে স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়)
রান্নার প্রস্তুত প্রণালি (ধাপে ধাপে)
একটি পারফেক্ট লেমন রাইস তৈরির জন্য প্রতিটি ধাপ মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করা জরুরি।
ধাপ ১: বাদাম প্রস্তুত করা
প্রথমে একটি শুকনো প্যান বা তাওয়া চুলায় দিন। প্যান গরম হলে সামান্য মাখন ব্রাশ করে নিন। এবার কাঠবাদামগুলো দিয়ে মৃদু আঁচে ভাজতে থাকুন। বাদামগুলো হালকা সোনালি রঙ ধারণ করলে এবং সুন্দর ভাজা ঘ্রাণ বের হলে নামিয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন যেন পুড়ে না যায়, এতে তিতকুটে ভাব চলে আসবে।
ধাপ ২: ডাবল বয়লার প্রস্তুত করা
এই রেসিপির সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট হলো এটি সরাসরি আগুনের তাপে রান্না হয় না। এর জন্য ‘ডাবল বয়লার’ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
* একটি বড় ছড়ানো হাঁড়িতে অর্ধেকের বেশি পানি নিয়ে চুলায় বসান।
* পানি ফুটে উঠলে, তার ওপর আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট হাঁড়ি বা সসপ্যান বসান। খেয়াল রাখবেন, নিচের ফুটন্ত পানি যেন ওপরের ছোট হাঁড়ির তলায় খুব বেশি ধাক্কা না দেয়, ভাপেই রান্না হবে।
ধাপ ৩: মূল রান্না শুরু
এবার ওপরের ছোট হাঁড়িতে একে একে উপকরণগুলো মেশানোর পালা।
* হাঁড়িতে ধুয়ে পানি ঝরানো বাসমতী চাল দিন।
* এর সাথে চিকেন স্টক, সাধারণ পানি, মিহি পেঁয়াজ কুচি এবং ভাজা কাঠবাদাম দিন।
* মশলা হিসেবে এলাচ গুঁড়া ও জয়ফল গুঁড়া যোগ করুন।
* স্বাদের ব্যালেন্সের জন্য মধু, লেবুর রস এবং মাখন দিয়ে দিন।
* সবকিছু আলতো হাতে একবার নেড়ে মিশিয়ে নিন।
* এবার ঢাকনা দিয়ে মাঝারি আঁচে (নিচের হাঁড়ির পানির তাপে) প্রায় ৩০ মিনিট রান্না করুন। এই সময়ে চাল স্টক শুষে নিয়ে সেদ্ধ হবে এবং সব ফ্লেভার চালের ভেতরে ঢুকবে।
ধাপ ৪: মটরশুঁটি ও সবজি প্রসেসিং
চাল রান্না হতে হতে মটরশুঁটিগুলো তৈরি করে নিন।
* আরেকটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে নিন।
* ফুটন্ত পানিতে মটরশুঁটিগুলো দিয়ে ২ মিনিট সেদ্ধ করুন।
* টিপস: মটরশুঁটি সেদ্ধ করার সময় ঢাকনা দেবেন না। ঢাকনা ছাড়া সেদ্ধ করলে মটরশুঁটির সেই উজ্জ্বল সবুজ রঙ অটুট থাকে, যা পোলাওয়ের সৌন্দর্য বাড়ায়। সেদ্ধ হলে পানি ঝরিয়ে রাখুন।
ধাপ ৫: দম ও ফিনিশিং টাচ
৩০ মিনিট পর চাল চেক করুন। পানি শুকিয়ে চাল সেদ্ধ হয়ে এলে ঢাকনা খুলুন।
* এবার সেদ্ধ করা মটরশুঁটি এবং ধুয়ে রাখা কিশমিশ ভাতের সাথে আলতো করে মিশিয়ে দিন।
* লেমন জেস্ট যোগ করুন: রান্নার একেবারে শেষ পর্যায়ে লেমন জেস্ট (লেবুর খোসা কুচি) ছড়িয়ে দিন। আগে দিলে অনেক সময় তিতকুটে ভাব হতে পারে, শেষে দিলে লেবুর সতেজ ঘ্রাণ বজায় থাকে।
* এবার হাঁড়িটি ঢেকে একদম কম আঁচে বা দমে আরও ১০ থেকে ১৫ মিনিট রাখুন। এতে চাল একদম ঝরঝরে হবে এবং সব ফ্লেভার একে অপরের সাথে মিশে যাবে।
ধাপ ৬: পরিবেশন
দম দেওয়া শেষ হলে ঢাকনা খুলুন। দেখবেন পুরো ঘর লেবু, মাখন আর মশলার এক স্বর্গীয় ঘ্রাণে ভরে গেছে। গরম গরম লেমন রাইস একটি সুন্দর ডিশে সার্ভ করুন। সাজানোর জন্য ওপরে আরও কিছু ভাজা বাদাম বা পুদিনা পাতা ছিটিয়ে দিতে পারেন।
লেমন রাইসের সাথে কী খাবেন?
এই লেমন রাইসটি নিজেই স্বাদে ভরপুর। তবুও এর সাথে কিছু সাইড ডিশ থাকলে খাওয়াটা জমে ক্ষীর!
১. গার্লিক বাটার চিকেন: লেবুর টক স্বাদের সাথে মাখন ও রসুনের ফ্লেভার দারুণ মানায়।
২. বিফ ভুনা: ঝাল ঝাল গরুর মাংসের ভুনা লেমন রাইসের টক-মিষ্টি স্বাদের সাথে একটি পারফেক্ট কন্ট্রাস্ট তৈরি করে।
৩. ফিশ ফ্রাই: মুচমুচে কোরাল বা ভেটকি মাছ ভাজার সাথেও এটি অনবদ্য।
কিছু জরুরি টিপস ও সতর্কতা
* চাল ধোয়া: বাসমতী চাল রান্নার আগে অন্তত ২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে তারপর পানি ঝরিয়ে নেবেন। এতে ভাত লম্বা ও ঝরঝরে হয়।
* লেবুর ব্যবহার: লেবুর রস খুব বেশি দেবেন না, এতে ভাত বেশি টক হয়ে যেতে পারে। ৩ টেবিল চামচ ১ কাপ চালের জন্য আদর্শ।
* ডাবল বয়লার কেন? সরাসরি তাপে রান্না করলে স্টকের কারণে নিচে লেগে যাওয়ার ভয় থাকে এবং চাল ভেঙে যেতে পারে। ডাবল বয়লারে রান্না করলে ভাতের টেক্সচার বাটার ও মধুর কারণে অনেক বেশি স্মুথ ও ক্রিমি হয়, অথচ ঝরঝরে থাকে।
* চিকেন স্টক: বাজারে কেনা চিকেন কিউব গুলিয়ে স্টক বানাতে পারেন, অথবা ঘরে মুরগির হাড় সেদ্ধ করেও স্টক তৈরি করে নিতে পারেন। ঘরে তৈরি স্টকের স্বাদ সবসময়ই ভালো হয়।
পরিশেষে
শীতের দুপুরে ধোঁয়া ওঠা এক প্লেট লেমন রাইস, সাথে প্রিয়জনদের আড্ডা—এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? একঘেয়ে সাদা ভাত বা রিচ বিরিয়ানি থেকে বিরতি নিতে আজই ট্রাই করুন এই রেসিপিটি। খুব অল্প সময়ে, ঘরোয়া উপকরণেই তৈরি হয়ে যাবে ফাইভ স্টার মানের এই ডিশ।
আতিয়া আমজাদের এই দুর্দান্ত রেসিপিটি ফলো করে রান্না করুন এবং কেমন হলো তা আমাদের জানাতে ভুলবেন না। রান্নার ছবি তুলে শেয়ার করতে পারেন আমাদের পেজে। শুভ ভোজন!


