শহরের ব্যস্ত রাস্তার এক কোণে ছোট একটি কফিশপে জানালার পাশে বসে ছিল আরিয়ান। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। কাঁচের ওপর গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জলবিন্দুগুলো যেন জীবনের এক একটি অধ্যায়, যা একবার নিচে পড়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না।
আরিয়ানের হাতে তার পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির পাতায় পাতায় দশ বছর আগের এক তরুণের আকাশচুম্বী সব স্বপ্ন লেখা ছিল। সে চেয়েছিল একজন বড় আর্কিটেক্ট হবে, নিজের নকশা করা অট্টালিকা দিয়ে শহর সাজাবে। ভেবেছিল প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে এক সুন্দর ছিমছাম জীবন কাটাবে। কিন্তু আজ দশ বছর পর, সে একটি সাধারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বেতনে কাজ করছে। তার সেই নকশাগুলো ডায়েরির পাতায় ধুলো জমা স্কেচ হয়েই রয়ে গেছে। আর যে মানুষটিকে নিয়ে সে জীবন সাজাতে চেয়েছিল, সে আজ অন্য কারো ঘরনী।
জীবনের বাঁক বদল
মাঝে মাঝে আরিয়ান খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। সে ভাবে, তবে কি সে ব্যর্থ? ঠিক তখনই কফিশপের ওয়েটার ছেলেটি এক কাপ গরম কফি দিয়ে গেল। ছেলেটির মুখে অমলিন হাসি। আরিয়ান জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি যা চেয়েছিলে সব পেয়েছ?”
ছেলেটি একটু থমকে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল, “স্যার, জীবনটা তো একটা বিশাল লাইব্রেরি। আমরা সব বই একসাথে পড়তে চাই, কিন্তু সময় আর সামর্থ্য হয়তো একটা বা দুটো পড়ার অনুমতি দেয়। যা পাইনি তা নিয়ে আফসোস করলে, যা পেয়েছি তা উপভোগ করা হবে না।”
আরিয়ানের মনে হলো কথাটা তীরের মতো তার হৃদয়ে বিধল।
প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব
আমরা সবাই এক বুক আশা নিয়ে পথ চলতে শুরু করি। কিন্তু জীবন কোনো সুনির্দিষ্ট চিত্রনাট্য নয়। এখানে অপ্রত্যাশিত ঝড় আসে, রাস্তার মোড় ঘুরে যায়।
- সব আশা পূরণ না হওয়ার মানে কি হার মেনে নেওয়া? একদমই না।
- হয়তো আরিয়ান আর্কিটেক্ট হতে পারেনি, কিন্তু সে তার অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পেরেছে।
- হয়তো সে প্রিয়তমাকে পায়নি, কিন্তু সে তার ছোট বোনকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পেরেছে।
”মানুষের ইচ্ছাশক্তি অসীম হতে পারে, কিন্তু ভাগ্য সবসময় সেই ইচ্ছার দাস হয় না। তবে এই না পাওয়াগুলোই আমাদের মানুষ হিসেবে আরও পরিণত এবং ধৈর্যশীল করে তোলে।”
শেষ কথা
কফি শেষ করে আরিয়ান বাইরে বের হলো। বৃষ্টি থেমে গেছে, তবে আকাশে রংধনু দেখা যাচ্ছে না। তাতে কী? ভিজে যাওয়া পিচঢালা রাস্তায় শহরের নিয়ন আলোর প্রতিফলনটাও দেখতে মন্দ লাগছে না।
আরিয়ান বুঝল, জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সকল আশা পূরণ হয় না—আর এটাই জীবনের ধ্রুব সত্য। কিছু শূন্যতা থাকলেই তো পূর্ণতার মূল্য বোঝা যায়। সে বুক ভরে দম নিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল, এক নতুন স্বপ্নের সন্ধানে নয়, বরং যা আছে তাকে ভালো রাখার প্রচেষ্টায়।